http://somagom.com/wp-content/uploads/2020/04/coronavirus.jpg

করোনাভাইরাস কি ? রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করনীয়

করোনাভাইরাস সারা বিশ্বব্যাপি মারাত্মক রুপ ধারন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে বিশ্ব মহামারী ঘোষণা করছেন। এই মহামারীর ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশও। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জনের প্রাণহানিও ঘটেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার তূলামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। আর এই মহামারী করোনাভাইরাস হতে রক্ষা পেতে সরকারের পক্ষ হতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়ছে।

সর্বশেষ আপডেট পাওয়া পর্যন্ত এখন পর্যন্ত কোন প্রতিষোধক আবিষ্কার হয় নি। তবে এই ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ডাক্তার ও গবেষকরা কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে বলেছেন।

করোনাভাইরাস কি ?

নভেল করোনাভাইরাস বা সংক্ষেপে COVID-19. এর আরও কয়েকটি নাম রয়েছে। এটি এক ধরনের সংক্রামক ভাইরাস যা এই প্রথম ধরা পড়ে এবং আগে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। চীনের উহান প্রদেশে প্রথম নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক বৃদ্ধার সন্ধান পাওয়া যায়। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস  ডিজিজ ২০১৯।

এই করোনা ভাইরাসের আরও অনেক গুলো প্রজাতি রয়েছে। তবে এদের মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষের ক্ষতি সাধন করতে পারতো বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন। তবে নতুন এই প্রজাতি নিয়ে এর সংখ্যা দাঁড়ালো ৭ এ।

COVID-19 এর উৎপত্তি

গবেষণা বলে বেশিরভাগ ভাইরসই শুরুতে অন্য প্রানি হতে মানব শরীরে বাসা বাধে; তবে এই ভাইরাসকে আনেকেই মানব সৃষ্টি জৈব ভাইরাস বলে দাবি করে আসছে। তবে এর সত্যতা নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সমালোচনা।

সর্বশেষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী এই ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে চিনের উহান শহরের একটি হাসপাতালে; এবং  চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক মাছের বাজারে এক পাইকারি দোকানদার এই আক্রন্ত হয়।

চীনের সরকারী নথী অনুসারে আক্রান্ত ব্যাক্তির বয়স ছিল ৫৫ বছর; করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর তারিখে তার দায়িত্বরত চিকিৎসক নিশ্চিত করেন; এর পর থেকেই ওই শহরে আক্রান্তের সংখ্যা হুহু করেয়া বাড়তে শুরু করে।

জানুয়ারি ২০২০ এর দিকে তা চীনের অন্যান শহরেও ছড়িয়ে পড়ে; এর এর অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ওই সময়ে চীনে নববর্ষ অনুষ্ঠানের কারনে অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে।

করোনাভাইরাস কিভাবে ছড়ায় ?

দিনে দিনে এই করোনাভাইরাস মহামারী আকার নিচ্ছে । আর বেড়িয়ে আসছে নিত্য নতুন তথ্য। প্রাথমিক ভাবে চীন জানায় এটি মানুষের মাধ্যমে ছাড়ায় না। আসলে এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে বিক্ষিপ্ত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর আশেপাশে থাকা অপর কোন ব্যক্তি মাঝে সেই ভাইরাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়।

আকারে অন্যান্য ভাইরাসের মতো বড় না হওয়ায় এই ভাইরাস বাতাসে বেশি সময় ভেসে থাকতে পারে না; তবে আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন লেগে থাকতে ও বেঁচে থাকতে পারে। আর ওই জায়গাগুলো অন্য কোন ব্যাক্তি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে এবং ওই হাত মুখ, চোখ কিংবা নাকে হাত দিলে ওই ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে।

করোনাভাইরাস রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ কি ?

দিন দিন যতো যাচ্ছে করোনাভাইরাস নিয়ে আরও বেশি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসছে; এবং এই করোনাভাইরাস নিয়মিত জিন পরিবর্তন করছে বলেও দাবি করছেন এক দল গবেষক; গবেষকদের ধারনা মতে এই মহামারী ভাইরাসে যখন কেউ আক্তান্ত হয় সাথে সাথে বোজা যায় না। সাধারনত পাঁচ দিনে এই ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষন প্রকাশ পেতে শুরু করে। তবে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে দুই থেকে ১৪ দিন বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

নতুন এই করোনাভাইরাসে ৮৩ থেকে ৯৩ শতাংশ রোগীর জ্বর, ৭৬ থেকে ৮২ শতাংশ রোগীর শুকনো কাশি, ১১ থেকে ৮৮ শতাংশ রোগীর অবসাদ বা পেশীতে ব্যাথা এবং এক পর্যায়ে শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসনালীর নানা রোগ হয় বলে গবেষকরা জানান। এছাড়া মাথা ব্যাথা, তলপেট ব্যাথাও হয়ে  থাকে বলে জানান।

পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে গেলে ডায়রিয়া ও কফসহ কাশি হয়। এছাড়া যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি হয়; তবে আক্রান্ত হবার প্রথম সপ্তাহের আগে জটিল আকার দেখা নাও দিতে পারে। তবে ২য় সপ্তাহে এসে এটি খুব জটিল ও মারাত্মক আকার ধারন করে।

বিশেষ গবেষণায় জানা যায় ( গবেষকদের মতে ) করোনাভাইরাসে আক্রান রোগীদের শ্বেত রক্তকনিকার সংখ্যা হ্রাস পায়; রোগীদের ফুসফুসের ক্ষতি বাড়তে থাকে এবং এরই সাথে সাথে ধমনীর রক্তে অক্সিজেনের সল্পতা দেখা দেয়। এর ফলে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কখনও কখনও কৃত্রিম ফুসফুসের ভেতর রক্ত পরিচালনার মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেন সরবারাহ করতে হয়।

রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি

আপনার মাঝে বা আপনার পরিবার বা পরিচিতদের মাঝে এমন উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত পরীক্ষা করান; সাম্প্রতিক গবেষকরা করোনাভাইরাস আক্রান্তের সনাক্ত করার জন্য কীট আবিষ্কার করেছেন।

পরিক্ষাটি হচ্ছে পলিমারেজ চেইন রিএকশন বা পিসিয়ার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয়ের জন্য ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করা হয়।

রক্ত পরীক্ষাঃ রোগীর রক্ত পরিক্ষা করে দেখা যায় এই ভাইরাসে আক্রান্তের কারনে তাদের শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা হ্রাস পায়। ।

ইমিউনিঅ্যাসে সেরোলজি পরিক্ষার মাশ্যমে এলিসা এন্টিবডি পরিক্ষন সামগ্রী ব্যবহার করা হয় যেন আক্রান্ত দেহের  প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে এন্টিবডি তৈরি করে তা শনাক্ত করে রোগ নির্ণয় করা হয়। আর এই পরিক্ষার দ্বারা IgM এবং IgC অ্যান্টিবডি উপস্থিত জানা যাবে ও ১৫ মিনিটের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যায়।

করোনাভাইরাস রোগের চিকিৎসা ?

COVID-19 রোগের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয় নি। তাই এই সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি এখনও বের হয় নি; তবে বিভিন্ন দেশের গবেষক ও বিজ্ঞানিরা এর প্রতিষেধক আবিস্কারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তবে কিছু কিছু দেশে কিছু প্রতিষেধক পরীক্ষামূলক ভাবে চালাচ্ছে। কার্যকরী ফলাফল পাওয়া গেলে তা সকল আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করবে বলে তারা আশা করছেন।

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষায় কর্তৃপক্ষের করণীয়

যেহেতু করোনাভাইরাস রোগের কোন প্রতিষেধক নেই; তাবে এই মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।  বিশ্ব স্যাস্থ্য সংস্থার মতেঃ

পরীক্ষণ

যেহেতু করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তি হতে এই ভাইরাস কমিউনিটির মধ্যে অন্য ব্যাক্তির মাঝে ছড়ায়; তাই আক্রান্ত ব্যাক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদেরকে কমিউনিটি হতে আলাদা করা। এবং আক্রান্ত হলে নীবির পর্যবেক্ষণে রাখা।

আইসোলেসন

আইসোলেশন কি ? আইসোলেশন হচ্ছে কোন ব্যক্তির দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে তাদের হাসপাতালের বিশেষ ইউনিটে বা বিভাগে রেখে বিশেষ পরিচর্যা করা; যাতে করে অন্যদের মাঝে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে।

কোয়ারিন্টেন

যার বাংলা অর্থ সঙ্গনিরোধ। করোনায় আক্রান্ত হয়নি তবে, কারো মাঝে উপরে উল্লেখিত উপসর্গ দেখাদিলে বা আশে পাশে কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমতো আবস্থায় এই সকল ব্যাক্তিদের উচিত হোম কোয়ারিন্টেনে থাকা। এজন্য তাদের আলাদা ভবনে বা নিজ বাসবভনে আলাদা করে রাখা হয়। বিশেষ করে বিদেশ ফেরত বা আক্রান্ত ব্যাক্তির সংস্পর্শে যাওয়া ব্যাক্তিদের জন্য হোম কোয়ারিন্টেন বাধ্যতামূলক।

লকডাউন

লকডাউন যার বাংলা অর্থ হচ্ছে অবরুদ্ধকরন। যখন কোন এলাকায় COVID-19 এ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায় না আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায় ওই এলাকা বা শহর লকডাউন করে দেওয়া হয়। অবস্থা বেশি খারাপ হলে সমগ্র দেশ লকডাউন করা হয়। অর্থাৎ ওই দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা সাপেক্ষে অন্যান্য সকল লোকদের বাসা হতে বের হতে না দেওয়া, পরিবহন ব্যবহার বন্ধ করা এবং জনসমাগম নিসদ্ধ করা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যাক্তি পর্যায়ে করনীয়

সরাকার বা কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব না; এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, সঙ্গনিরোধ, সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হচ্ছেঃ

সামাজিক দূরত্ব

প্রথমত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যেহেতু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যাক্তির লক্ষন বা উপসর্গ সাথে সাথেই দেখা দেয় না; তাই আপনার আমার আশেপাশে কে আক্রান্ত তা বোজা সম্ভব না। তাই নিজে সতর্ক থাকতে হবে; বিনা প্রয়োজনে বাহিরে বের হওয়া। জনসমাগম এরিয়ে চলতে হবে।

হাত ধোয়া

নিয়মিত কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় ধরে হাত ধুতে হবে। এর ফলে আপনার হাত করোনা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসলে তা যেন মুক্ত হয়ে যায়। দিনে নুন্যতম ৪-৫ বার হাত ধোয়া উচিত; এছাড়া বাহিররে বের হয়ার সময় হাতে জীবাণুনাশক লাগিয়ে নেওয়া যেতে পারে ও বাহির হতে বাসায় ফিরে ভালো করে হাত মুখ ধোয়া; পরনে থাকা পোশাক হাল্কা গরম পয়ানিতে বা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা।

চোখ মুখ নাক স্পর্শ না করা

যেহেতু করোনাভাইরাস কোন ব্যাক্তি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে এবং ওই হাত মুখ, চোখ কিংবা নাকে হাত দিলে ওই ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে; তাই খালি হাতে এ সকল জায়গা স্পর্শ করা হতে বিরত থাকতে হবে।

জিবানুনাশক স্প্রে

মানুষের হাতের স্পর্শে আসে এমন জায়গা যেমন- দরজার হাতল, সিঁড়ির রেলিং, বেলকুনি, কম্পিউটারের কি বোর্ড, মাউস, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য জায়গাইয় নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে বা দ্রবন দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

পরিষ্কার পরিছন্নতা ইমানের অঙ্গ। আর পরিষ্কার পরিছন্ন থাকলে অন্যান্য রোগ বালাই হতেও মুক্ত থাকা যায়; তাই যেখানে সেখানে কফ থুতু ফেলা থেকে বিরিত থাকতে হবে কারন এই মাধ্যমে করোনাভাইরাস সব থেকে বেশি ছড়ায়।

অন্যান্য

হাসপাতালে যারা রোগীর চিকিৎসা সেবা দদা করেন তাদের নিয়মিত হাত মোজা চিকিৎসা মুখোশ পরিধান করা; সাধারন কেউ বাহিরে বের হলে মাস্ক ও গ্লাভস পড়ে বের হওয়া উচিত।

বিশেষ অনুরোধ

প্রিয় পাঠক, আমরা সবাই কঠিন সময় পার করছি। সবার সম্মিলিত চেষ্টা হয়তো আমাদের এই মহামারী হতে মুক্তি দিতে পারে; সবাই সবার জায়গা হতে নিয়ম কানুন মেনে চলুন। অন্যকে উৎসাহিত করুন। আপনার সামর্থ্য থাকেল অন্যকে সাহায্য করুন যাতে তার বাহিরে বের হতে না হয়। সমাগম পরিবার আশা করে আমদের প্রিয় মানুষগুলো এই নিয়ম ও সরকারি পরামর্শ মেনে চলবে।

করোনাভাইরাস সম্পর্কে আপনার কোন প্রশ্ন থাকেল কমেন্ট বক্সে লিখুন। আপনার প্রত্যেকটি মতামত আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ভাষায় প্রোডাক্ট রিভিউ, টেক আপডেট ও টেক টিপস পরতে নিয়মিত ভিজিট করুন আপনাদের প্রিয় সমাগম ডট কম। ভালোবাসা অবিরাম।

 

Leave a Reply